হিসাবরক্ষণ ও হিসাববিজ্ঞানের সংজ্ঞা (Definition of Book Keeping) : সব প্রতিষ্ঠানেই দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেন সংঘটিত হয়ে থাকে। কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এই আর্থিক লেনদেনগুলো পর্যায়ক্রমে প্রকৃতি ও তারিখ অনুসারে, স্বীকৃত রীতিনীতি অনুযায়ী সুশৃঙ্খল ও সুসংবদ্ধভাবে লিপিবদ্ধ করার কলাকৌশলকে হিসাবরক্ষণ (Book-keeping) বলা হয়। হিসাবরক্ষণ হলো হিসাববিজ্ঞানের লিপিবদ্ধকরণ ধাপ (Record keeping part)।
Table of Contents
হিসাবরক্ষণ ও হিসাববিজ্ঞানের সংজ্ঞা

সঠিকভাবে লেনদেন হিসাবের বইতে লিপিবদ্ধ করা না হলে ব্যবসায়ের আয়-ব্যয় ও সম্পত্তি সংক্রান্ত সঠিক তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়। সঠিক হিসাব না রাখলে নির্দিষ্ট সময়ান্তে প্রতিষ্ঠানের লাভ-ক্ষতি ও আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। নিম্নে বুক কিপিং সম্পর্কে বিভিন্ন হিসাব শাস্ত্রবিদদের মতবাদ উল্লেখ করা হলো :
(১) জে. আর. বাটলিবয় (J.R. Batllboi)-এর মতে,
“ব্যবসা সংক্রান্ত লেনদেনসমূহ এক গ্রন্থ হিসাবের বইতে লিপিবদ্ধ করার কলা-কৌশলকে বুক কিপিং বলে।
“Book keeping is the art of recording business dealings in a set of books.”
(২) আর. এন. কার্টার (R.N. Carter) এর মতে,
“অর্থ বা অর্থের মাপকাঠিতে পরিমাপযোগ্য জিনিসের হস্তান্তরিত কারবারি লেনদেনসমূহ হিসাবের বইয়ে শুদ্ধরূপে লিপিবদ্ধ করার বিজ্ঞান ও কলাকে বুক-কিপিং বলে। “
“Book keeping is the science and art of recording in books of account all those business transactions that results in the transfer of money of money’s worth.”
(৩) নর্থকট (Northcott)-এর মতে,
“বুক কিপিং বলতে আর্থিক ও বাণিজ্যিক লেনদেনগুলোকে যথাযথভাবে টাকার অঙ্কে হিসাবের বইতে লিপিবদ্ধ করার কলাকৌশলকে বুঝায়।”
“Book keeping is the art of recording in books of accounts, the monetary aspect of commercial or financial transaction.”
(৪) এফ. ডব্লিউ পিক্সলি (F. W. Pixly)-এর মতে,
“হিসাবরক্ষণ এমন একটি বিজ্ঞান যা সব ধরনের আর্থিক লেনদেন লিপিবদ্ধ করার বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করে।”
(৫) এল.সি. ক্রুপার-এর মতে,
“বুক কিপিং এমন একটা বিজ্ঞান যার সাহায্যে টাকা বা টাকায় পরিমাপযোগ্য লেনদেনসমূহ এমনভাবে লিপিবদ্ধ করে রাখা যায়, যাতে পরবর্তী যে কোনো তারিখে প্রত্যেক লেনদেনের প্রকৃতি ও ফলাফল পরিষ্কার বুঝতে পারা যায় এবং এতে করে পরে যে কোনো তারিখে এভাবে রক্ষিত তথ্যসমূহের ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত হিসাবসমূহ মালিকের আর্থিক অবস্থার প্রকৃত অবস্থা প্রদর্শন করতে পারে।”

বিজ্ঞ হিসাববিজ্ঞানী এবং অভিজ্ঞ লেখকদের উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলো পর্যালোচনার আলোকে আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে, হিসাববিজ্ঞান একটি সামাজিক বিজ্ঞান এবং একটি অন্যতম প্রধান ব্যবহারিক বিজ্ঞান যা ব্যবসায়ীকে তার কারবারি লেনদেনের সুশৃঙ্খল ও বিধিসম্মত হিসাবলিখন পদ্ধতি শিক্ষা দেয়। যার ফলে ব্যবসায়ী তার কারবারের বার্ষিক ফলাফল নির্ণয় করে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং লিখিত হিসাব তথ্যাবলি থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কারবার পরিচালনা করতে পারে।
হিসাবরক্ষণ ও হিসাববিজ্ঞানের ধারণা, সাধারণভাবে, হিসাববিজ্ঞান বলতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সুশৃঙ্খলভাবে লেনদেনের সংরক্ষণ, ফলাফল নির্ণয় ও বিশ্লেষণ করাকে নির্দেশ করে। হিসাবরক্ষণের অন্যতম কাজ হচ্ছে, আর্থিক লেনদেন সুসংবদ্ধভাবে হিসাবের বইতে লিপিবদ্ধ করা। কিন্তু হিসাববিজ্ঞানের প্রধান কাজ হল, হিসাবের বইতে লিপিবদ্ধ লেনদেন হতে হিসাব বিবরণী প্রস্তুত করা।
প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা, দেনা-পাওনার পরিমাণ, সম্পত্তির পরিমাণ, মূলধনের পরিমাণ, লাভ-ক্ষতির পরিমাণ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানার জন্য হিসাবের বই থেকে বিভিন্ন হিসাব বিবরণী প্রস্তুত করা হয়। যথা— কারবারের লাভ-ক্ষতির পরিমাণ জানার জন্য আমরা যে হিজাব প্রস্তুত করি তাকে লাভ-ক্ষতি হিসাব (Profit & Loss Account) বলে। কারবারের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য যে বিবরণী প্রস্তুত করা হয় তাকে উদ্ধতপত্র বলে।
এসব হিসাব বিবরণী প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক আর্থিক ফলাফল ও আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা প্রদান করে। অতএব, হিসাববিজ্ঞানের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পার হলো, কারবারের আর্থিক ফলাফল (নীট লাভ বা ক্ষতি) ও আর্থিক অবস্থা (সম্পত্তি ও দায়দেনা) অর্থপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা এবং সেই অর্থপূর্ণ তথ্যসমূহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপন করা।

বিভিন্ন সময়ে হিসাববিজ্ঞানিগণ বিভিন্নভাবে হিসাববিজ্ঞানকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিচে এঁদের কয়েকটি সংজ্ঞা বর্ণিত হলো :
(১) এফ. ডব্লিউ. পিকসলি (F.W.Pixly)-এর মতে,
“হিসাববিজ্ঞান এমন একটি বিজ্ঞান যা সব ধরনের আর্থিক লেনদেন লিপিবদ্ধ করার বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করে।”
(২) এ. ডব্লিউ. জনসন (A. W. Johnson)-এর মতে,
“অর্থের অংকে পরিমাপযোগ্য কারবারী লেনদেনসমূহ সংগ্রহ, সংকলন, সুসংবদ্ধকরণ, আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুতকরণ সেগুলোর বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যাকরণকে হিসাব বিজ্ঞান বলা হয়।” [“Accountancy may be defined as the collection, compilation and systematic recording business transactions of money, the preparation of financial reports, the analysis and interpretation of these reports and the use of these reports for the information and guidance of management.”]
(৩) আর. এন. এন্থনি (R.N. Anthony)-এর মতে,
“হিসাববিজ্ঞান কোন প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলী সম্পর্কে অর্থের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ, সংক্ষিপ্তকরণ, বিশ্লেষণ ও বিবরণ প্রদান করার একটি পদ্ধতি।”
(৪) আমেরিকান অ্যাকাউনটিং এসোসিয়েশন (American Accounting Association)-এর মতে,
“যে অর্থনৈতিক তথ্য নির্ণয়, পরিমাপ এবং সরবরাহ করার পদ্ধতিতে তথ্য ব্যবহারকারীগণ অর্থনির্ভর বিচার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে তাকে হিসাববিজ্ঞান বলে।” [Accounting refers to the process of identifying, measuring and communicating economic information to permit informed judgement and decisions by users of the information.”]
(৫) আমেরিকান সার্টিফাইড পাবলিক একাউন্টিং ইনস্টিটিউট (American Institute of Certified Public Accountants (AICPA) )-এর মতে,
“অন্তত আংশিকভাবে আর্থিক প্রকৃতিবিশিষ্ট বিভিন্ন প্রকার লেনদেন ও ঘটনাসমূহকে অর্থের মাধ্যমে লিপিবদ্ধকরণ, শ্রেণীবদ্ধকরণ ও ব্যাখ্যার আকারে সংক্ষেপকরণের কলাকৌশলকে হিসাববিজ্ঞান বলে। ” [Accounting is the art of recording, classifying and summarising in a significant manner and in terms of money, transactions and events, which are in part at least, of a financial character and interpreting the results thereof.]
(৬) অধ্যাপক নিডেলস, এন্ডারসন এবং ক্যাডওয়েল (Professor Needles, Anderson & Caldwell)-এর মতে,
“অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি পরিমাপকরণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং যোগাযোগকরণের তথ্য ব্যবস্থাকে হিসাববিজ্ঞান বলে। [Accounting in their book ‘Principles of Accounting as, “Accounting is an information” system for measuring, processing and communicating information that is useful in making economic decisions.
(৭) প্রফেসর জে.জে. ওয়েগ্যান্ড, ডি.ই. কাইসো এবং পি.ডি. কিমের (Professor J. J. Weygandt, D.E. Kieso & making economic decisions.”] P.D. Kimmel)-এর মতে,
“হিসাববিজ্ঞান একটি তথ্য ব্যবস্থা, যা আগ্রহী ব্যবহারকারীদের নিকট একটি প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক ঘটনাবলিকে চিহ্নিতকরণ করে, লিপিবন্ধ করে এবং যোগাযোগ স্থাপন করে। ” [“Accounting is an information system that identifies, records and communicates the অতএব, হিসাববিজ্ঞান হলো, এমন একটি সামাজিক বিজ্ঞান ও কলাকৌশল যা স্বীকৃত রীতি-নীতি অনুসারে কারবারি, economic events of an organization to interested users.”]

অকারবারি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সব রকমের আর্থিক লেনদেন ও আর্থিক পরিবর্তনের ঘটনাসমূহকে প্রকৃতি ও তারিখ অনুসারে সুশৃঙ্খল, সুসংবদ্ধভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ফলাফল নিরূপণ করে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীদের অবগতির জন্য সময়ে সময়ে প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপন করে, যা ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তগ্রহণে সর্বোত্তম সহায়ক। অতএব, হিসাববিজ্ঞানের উপরিউক্ত সংজ্ঞা হতে এর চারটি প্রধান উদ্দেশ্য প্রতীয়মান হয়। যথা—
(ক) আর্থিক ফলাফল নিরূপণ :
লাভ-ক্ষতি হিসাব প্রস্তুত করে নির্দিষ্ট সময়ের অর্থনৈতিক কার্যাবলির ফলাফল নিরূপণ করা।
(খ) আর্থিক অবস্থা নিরূপণ :
আর্থিক বছর শেষে নির্দিষ্ট তারিখে উদ্ধতপত্র প্রস্তুত করে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা নিরূপণ করা।
(গ) আর্থিক অবস্থার ব্যাখ্যা :
আর্থিক ফলাফল ও অবস্থার ব্যাখ্যা দান করা। (ঘ) ব্যবস্থাপনীয় তথ্যদান : দক্ষতার সাথে কার্য পরিচালনা ও নীতি নির্ধারণের উদ্দেশ্যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচালকমণ্ডলীকে বিভিন্ন তথ্যের যোগান দেওয়া।
